হেফাজত সবুজ
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৫৩

রাঙামাটির পাহাড়ে জুমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত চাষিরা। ছবি: সময় সংবাদ
হেমন্তের শুরুতে রাঙামাটির পাহাড়ে পাহাড়ে চলছে জুম ফসল কাটার ধুম। খরতাপ উপেক্ষা করে জুমিয়ারা তাদের কষ্টে অর্জিত ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে জুমে আগের মতো ফসল না হওয়ায় তাদের মনে দুশ্চিন্তা বেড়েছে। একই জমিতে ঘন ঘন জুম চাষের কারণেই ফলন কমে যাচ্ছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।
সুউচ্চ পাহাড় চূড়া; তার ভাঁজে ভাঁজে শোভা পাচ্ছে পাকা ধান। দেখে মনে হচ্ছে সবুজের মাঝে এক চিলতে সোনালি আভা। সমতল থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড়ে উঠলেই চোখে পড়বে এমন দৃশ্য। স্থানীয় অধিবাসীরা সেখানে পাহাড়ের পর পাহাড়জুড়ে জুম চাষ করেছেন। সেখানে ধানের সঙ্গে রোপণ করা হয়েছে কলা, হলুদ, ভুট্টা, তিলসহ বেশ কয়েক ধরনের ফসল।
এসব ফসলের ক্ষেতে চোখে পড়বে ছোট্ট ছোট্ট ঘর। এগুলোকেই বলা হয় জুমঘর। জুম পাহাড়ে সারিবদ্ধভাবে ধান কাটার এমন দৃশ্য যে কারও দৃষ্টি কাড়বে। মাড়াই করা ধান জুমঘরের বারান্দাতেই শুকানো হয়।
তবে জুম চাষের প্রক্রিয়া শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। প্রথম ধাপে পৌষ-মাঘ মাসে কাটা হয় পাহাড়ের ঢালের ঝোপঝাড়। দ্বিতীয় ধাপে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে কাটা ঝোপ আগুনে পুড়িয়ে পাহাড়কে করা হয় জুম চাষের উপযোগী। শেষে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সেই পোড়া জুমের মাটিতে একসঙ্গে রোপণ করা হয় বিভিন্ন বীজ। তারপর থেকেই সেই জুম এলাকায় গড়ে ওঠে অস্থায়ী এক বসতি, যার স্থায়িত্বকাল হয় ৩ থেকে ৪ মাস। পরে সেই ফসল নিয়ে তারা ফিরে যান নিজ গ্রামে। তবে এবার জুমে উৎপাদন কমে যাওয়ায় হতাশা বাসা বেঁধেছে জুমিয়াদের মনে।
জুমচাষি হ্লা প্রু মারমা বলেন, ‘এবার জুমে ফলন কম হয়েছে। যে ধান পেলাম তা দিয়ে আমার পরিবারে সারা বছরের খাবার হবে না। আগে ২০ কেজি ধান রোপণ করলে কম করে হলেও ৮০-৯০ মণ ধান পেতাম। এবার খুব বেশি হলে ৩০ মণ হবে।’
সাই চু প্রু মারমা বলেন, ‘এটাই আমাদের বর্তমান ঠিকানা। আজ থেকে প্রায় ৪ মাস আগে আমরা এখানে অস্থায়ী বসতি গড়েছিলাম। তিল ও হলুদের জন্য হয়তো আর মাস খানেক থাকতে হবে। তারপরই গ্রামে ফিরে যাব। দুই থেকে তিন বছর পর আবার এখানে জুম চাষ করতে আসব। তবে আগামী বছর কোথায় চাষ করব, সেই পাহাড়ও এখনো ঠিক হয়নি। অথচ পৌষ মাসের মধ্যে পাহাড়ের ঝোপঝাড় কাটতে না পারলে চাষ করা যাবে না।’
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘একসময় জুম চাষের জমি অন্তত ৮-১০ বছর বিরতি দিয়ে চাষ করা হতো। এখন বনভূমি কমে গেছে। সঙ্গে পাহাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাড়তি মানুষের খাবারের চাহিদা মেটাতে একই জমিতে ঘন ঘন জুম চাষ করা হচ্ছে। ফলে জুমের উৎপাদন কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন বীজ সরবরাহ করে থাকি, যাতে তাদের উৎপাদন বাড়ে। একইসঙ্গে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে জুম চাষ করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। পাশাপাশি জুমিয়াদের বিকল্প চাষের প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা চলছে, যাতে জুমনির্ভরতা কমে আসে।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর রাঙামাটিতে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। সেখানে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হযেছে ১২ হাজার মেট্রিক টন, আর সবজি ২৫ হাজার মেট্রিক টন।

