সুজাউদ্দিন রুবেল, কক্সবাজার
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:০৬

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাগর শান্ত হলেই দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। নতুন নতুন দস্যু গ্রুপ সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারকে লক্ষ্য করছে। জীবিকার তাগিদে সাগরে যেতে হলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন জেলেরা। তবে জলদস্যু ও ডাকাতদের তৎপরতা ঠেকাতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে কোস্টগার্ড। আধুনিক জাহাজ ও উচ্চগতির স্পিডবোটের পাশাপাশি রাডার, জিপিএস ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
‘হঠাৎ এসে সবকিছু লুট করে নেয়’
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের জেটিঘাটে বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে আছে সারি সারি মাছ ধরার ট্রলার। ট্রলারে অবস্থান করছেন জেলেরা। তবে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেও তাঁদের মধ্যে রয়েছে আতঙ্ক।
এফবি নিশান ট্রলারের জেলে ফরিদ বলেন, রাতে সাগরে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। হঠাৎ দস্যুরা ট্রলারে উঠে জেলেদের মারধর করে এবং মাছসহ ট্রলারে থাকা বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে আব্দুর রহিম বলেন, ‘একই ধরনের বোট, একই ধরনের মানুষ। কিন্তু তারা অতর্কিত এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। জাল, মাছ ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ট্রলারে ভালো কোনো প্যান থাকলেও সেটিও নিয়ে যায়।’
জেলেদের ভাষ্য, অনেক সময় হামলার শিকার হয়ে আহত হওয়ার পাশাপাশি ট্রলারের ইঞ্জিন, জাল, মাছসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম হারাতে হয়। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও।
জলদস্যুমুক্ত সাগর চান ব্যবসায়ীরা
কক্সবাজারে কয়েক লাখ জেলে কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলারে করে সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। জলদস্যুদের তৎপরতা বাড়ায় তাঁদের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি ও ট্রলার মালিক শওকত ওসমান ফারুক বলেন, সাগর শান্ত ও শীতল হয়ে এলে জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়ে যায়। বিভিন্ন মোহনা ও যেসব এলাকায় দস্যুরা আস্তানা গড়ে তুলেছে, সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
শওকত ওসমান ফারুক বলেন, ‘আমরা ট্রলার মালিকেরা জলদস্যুমুক্ত নিরাপদ সাগর চাই। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা চাই। এ জন্য সরকারের কাছে জলদস্যুমুক্ত সাগর নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
নজরদারি বাড়িয়েছে কোস্টগার্ড
কক্সবাজার, সোনাদিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সংলগ্ন সাগরে কোস্টগার্ডের একাধিক টহল দল অভিযান চালিয়েছে। এ সময় মাছ ধরার ট্রলারে থাকা জেলেদের সঙ্গে কথা বলে দস্যুদের তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
কক্সবাজার কোস্টগার্ড স্টেশনের কমান্ডার লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেন বলেন, ডাকাত ও জলদস্যু দমনে কোস্টগার্ড নিয়মিতভাবে কাজ করছে। কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও মাছ ধরার নৌযানে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, জলদস্যু ও ডাকাত চক্রের অপতৎপরতা প্রতিহত এবং জড়িত ব্যক্তিদের আটকের লক্ষ্যে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আধুনিক জাহাজ ও উচ্চগতির স্পিডবোটের মাধ্যমে টহলের পাশাপাশি রাডার, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় চলাচলকারী নৌযান এবং সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞার সময় নজরদারি আরও বাড়বে
লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেন জানান, ৫ অক্টোবর দিনব্যাপী কোস্টগার্ড বেস চট্টগ্রাম, কোস্টগার্ড জাহাজ ‘সবুজ বাংলা’, স্টেশন কক্সবাজার, মহেশখালী, মাতারবাড়ী ও কুতুবদিয়ার আওতাধীন সমুদ্র এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও জেলেদের নিরাপত্তায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
বহিঃনোঙর থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত কোস্টগার্ডের সব আউটপোস্ট ও মোতায়েন করা জাহাজের মাধ্যমে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে। এ সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরা ও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকার সুযোগে কোস্টগার্ডের গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রকে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোস্টগার্ড বলছে, দেশের সমুদ্র, নদীপথ ও উপকূলীয় অঞ্চলকে ডাকাত ও জলদস্যুমুক্ত রাখতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন নিবন্ধিত ৫ হাজার ২০০-এর বেশি নৌযান গভীর সাগরে যায়। জেলেদের দাবি, জলদস্যুর আতঙ্ক দূর করে নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

