মুক্তকথা

ভিয়েতনামের শিক্ষা ভুলে হরমুজে একই বাস্তবতার মুখে যুক্তরাষ্ট্র

সামি আল-আরিয়ান

প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২৮

ভিয়েতনামের শিক্ষা ভুলে হরমুজে একই বাস্তবতার মুখে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ছবি: রয়টার্স

গত ২২ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্য হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখন কার্যত বন্ধ। অথচ এর চারপাশে রয়েছে বিলিয়ন ডলারের মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। কিন্তু এসব যুদ্ধজাহাজও বাণিজ্যিক বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অল্প কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি নিতে রাজি করাতে পারছে না।

মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চাইলে প্রায় যেকোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

 

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর সাত মাসে ওয়াশিংটন চাপ প্রয়োগের তিনটি কৌশল নিয়েছে—ব্যাপক বিমান হামলা, নৌ অবরোধের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে চাপে ফেলা এবং সরাসরি পাল্টাপাল্টি সামরিক উত্তেজনা। কিন্তু এর কোনোটিই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারেনি।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনী আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যা করতে পারে। কিন্তু তেহরানকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে এখনো ব্যর্থ হয়েছে।

 

ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং বর্তমান উপসাগরীয় যুদ্ধ—তিনটি ভিন্ন সময়ের ঘটনা এবং প্রতিপক্ষও এক নয়। ফলে এগুলোকে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। তবে প্রতিটি ঘটনাই মার্কিন সামরিক শক্তির সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বার্তা দেয়।

 

‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ শুধু মার্কিন জনগণের মধ্যে সেনা হতাহতের প্রতি অনীহা বোঝায় না। এটি ছিল মার্কিন সামরিক শক্তির কার্যকারিতা, নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে এর উপযোগিতার ওপর আস্থার সংকট।

 

যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোচীনে ৫ লাখের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন। নিহত হন লাখ লাখ ভিয়েতনামিও। ওয়াশিংটন বিপুল পরিমাণ বোমা ফেলেছে, বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক বাহিনী ব্যবহার করেছে এবং সাইগনে নিজেদের সমর্থিত সরকারকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরপরও শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধে হেরে যায়।

 

ভিয়েতনামে ওয়াশিংটন এই শিক্ষা পেয়েছিল যে, বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও এমন কোনো প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য করা যায় না, যে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এর ১৬ বছর পর উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, সেই শিক্ষা তারা চিরতরে পেছনে ফেলে এসেছে। বর্তমানে হরমুজের শান্ত জলরাশিতে দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন আবারও সেই একই শিক্ষা পাচ্ছে।

 

সাইগন ভূত

 

১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে প্যারিস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন যুদ্ধরত সেনাদের প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়। এর দুই বছর পর, ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল, উত্তর ভিয়েতনামের ট্যাংকগুলো সাইগনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একই সময়ে পতনের মুখে থাকা রাজধানীর বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে মার্কিন হেলিকপ্টারে করে লোকজন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।

 

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সরকারি ইতিহাসে ওই দিনটিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের কার্যত সমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিনের সেই দৃশ্যগুলো মানুষের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। কারণ ওই পরাজয় শুধু সামরিক ছিল না, এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও ছিল।

 

ভিয়েতনাম যুদ্ধ মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে ছিল এবং প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। তবুও ভিয়েতনামে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। হ্যানয় যে বিষয়টি ওয়াশিংটনকে বুঝতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল, তা ছিল—দুর্বল প্রতিপক্ষকে যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতেই হবে এমন নয়; শুধু এতদিন টিকে থাকলেই হবে, যতক্ষণ না মার্কিন রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও ধৈর্য ফুরিয়ে যায়।

 

এই যুদ্ধ ওয়াশিংটনের নীতিতেও পরিবর্তন আনতে শুরু করেছিল। ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ভেটো উপেক্ষা করে মার্কিন কংগ্রেস ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ পাস করে। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের একতরফাভাবে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করা। এর আগে ১৯৬৯ সালে ঘোষিত ‘নিক্সন ডকট্রিনে’ আঞ্চলিক মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

 

সাইগনের পতনের পর প্রায় ১৫ বছর ধরে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নীতিনির্ধারকদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এটি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, মার্কিন সামরিক শক্তি দিয়ে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। বিদেশে বড় আকারের স্থলসেনা মোতায়েনের যেকোনো প্রস্তাবই ‘সাইগনের ভূতের’ বাধার মুখে পড়ত। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করার পর।

 

১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ইরাকি বাহিনী কুয়েতে প্রবেশ করে। সে সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মার্কিন শক্তির জন্য প্রায় আদর্শ ছিল। সোভিয়েত ব্লক ভেঙে পড়ছিল এবং জার্মানি পুনরেকত্রীকরণের পথে ছিল। একই সময়ে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে সক্রিয় ছিলেন।

 

চীনও তখন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে আজকের তুলনায় অনেক দুর্বল এবং তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দমন-পীড়নের পর আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। ওয়াশিংটনের বিকল্প কোনো জোট গঠন বা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি তখন ছিল না।

 

প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান। এককভাবে অভিযান না চালিয়ে তিনি একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১২-২-১ ভোটে ৬৭৮ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। কিউবা ও ইয়েমেন প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় এবং চীন ভোটদানে বিরত থাকে। প্রস্তাবে ইরাক ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কুয়েত থেকে সরে না গেলে কুয়েত মুক্ত করতে ‘সব প্রয়োজনীয় উপায়’ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

মিশর, সিরিয়া, সৌদি আরব ও মরক্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশও সামরিক জোটে যোগ দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এত বড় আকারে আর কখনো মার্কিন সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়নি। ১৯৯১ সালের জানুয়ারির মধ্যে মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী প্রায় ২ হাজার সামরিক বিমান মোতায়েন করে। জোটের অন্য সদস্যদের আরও প্রায় ৬০০ বিমান এতে যুক্ত হয়।

 

১৭ জানুয়ারি ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ শুরু হলে প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দুই পক্ষের ব্যবধান ছিল বিপুল। ছয় সপ্তাহে জোট বাহিনী ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি যুদ্ধবিমান অভিযান পরিচালনা করে এবং প্রায় ৮৮ হাজার ৫০০ টন গোলাবারুদ নিক্ষেপ করে।

 

অবশেষে স্থল অভিযান শুরু হলে মাত্র ১০০ ঘণ্টার মধ্যেই তা শেষ হয় এবং কুয়েত মুক্ত করা হয়। প্রায় ৭ লাখ মার্কিন সেনা এ অভিযানে অংশ নেন। নিহত হন ৩০০ জনেরও কম।

 

ওয়াশিংটনে এই বিজয়ের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল ব্যাপক। প্রেসিডেন্ট বুশ কেবল কুয়েতের মুক্তি হিসেবে এ বিজয়কে তুলে ধরেননি; তিনি এটিকে আরও বড় অর্জন হিসেবে দেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের ১ মার্চ তিনি বিখ্যাত সেই মন্তব্যটি করেন, ‘ঈশ্বরের কসম, আমরা ভিয়েতনাম সিনড্রোমকে চিরতরে বিদায় করে দিয়েছি।’

 

মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস তারা ফিরে পেয়েছে—বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আবারও রাজনৈতিক ফলাফল এনে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় আঞ্চলিক বাহিনীকে পরাজিত করেছে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পুনরায় স্বাধীন করেছে এবং নিজেদের দৃষ্টিতে ভিয়েতনামের ভূতকেও বিদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

 

একমেরু বিশ্বের ফাঁদ

 

উপসাগরীয় যুদ্ধ প্রায় একই সময়ে ঘটে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের চূড়ান্ত পতন ও বিলুপ্তি ঘটে। এরপর আধুনিক ইতিহাসে এক অসাধারণ সময়ের সূচনা হয়। কারণ, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম কোনো বড় শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না।

 

বিশ্বের বড় অর্থনীতি, প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা এবং অতুলনীয় মিত্রজোটের নেটওয়ার্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ন্যাটো পূর্বদিকে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক মূলত পশ্চিমা শর্তে অর্থনৈতিক একীভূতকরণকে এগিয়ে নেয়।

 

মার্কিন শক্তি শুধু বিমানবাহী রণতরী ও সামরিক ঘাঁটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কোন নিয়মে পরিচালিত হবে, তা ক্রমেই ওয়াশিংটন নির্ধারণ করতে শুরু করে।

 

তবে কুয়েতে অর্জিত আত্মবিশ্বাস একসময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ফাঁদে পরিণত হয়। ওয়াশিংটন ক্রমেই একটি শত্রুর সামরিক শক্তি ধ্বংস করার সক্ষমতাকে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণের ক্ষমতা বলে ভুল করতে শুরু করে।

 

৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তান ও ইরাক সেই ভুলকে স্পষ্ট করে দেয়। আফগানিস্তানে দুই দশকের সামরিক অভিযান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা শেষ হয় ২০২১ সালে। শেষ মার্কিন পরিবহন বিমান কাবুল ছাড়ার সময় তালেবান আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে।

 

ইরাকে ২০০৩ সালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতন হয়। কিন্তু পরবর্তী দখলদারিত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয় কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার, পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাগদাদে ইরানের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

 

১৯৯১ সালে ভিয়েতনাম সিনড্রোমকে পরাজিত করা হয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ইরাক ও আফগানিস্তান দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই ওয়াশিংটন রাজনৈতিক ফলাফল নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করতে পারে না। বর্তমান আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরুর আগেই একমেরু বিশ্বব্যবস্থা ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল। চীন বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, রাশিয়া সামরিকভাবে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ মার্কিন জনগণকে ক্লান্ত করে তুলেছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে।

 

গাজা ওয়াশিংটনের সামনে আরও ভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি করেছে—বৈধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের অব্যাহত উপস্থিতিকে বেআইনি বলে রায় দেয়।

 

দক্ষিণ আফ্রিকার করা পৃথক গণহত্যা মামলায় আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা জারি করে। এসব ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য সিদ্ধান্ত বারবার প্রত্যাখ্যান বা অবজ্ঞা করা হয়েছে।

 

২০২৫ সালে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজে গাজায় সংঘটিত গণহত্যাকে ‘সম্মিলিত অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইসরাইলের মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম পৃথকভাবে তাদের প্রতিবেদনে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গাজায় নির্মূল ও গণহত্যার কর্মকাণ্ডের তথ্য নথিভুক্ত করে।

 

এই পুরো সময়ে জো বাইডেন ও ডনাল্ড ট্রাম্প উভয়ের প্রশাসনেই—ওয়াশিংটন তার ইসরাইলপন্থি মিত্রকে কূটনৈতিকভাবে সুরক্ষা দিতে নিজের প্রভাব ব্যবহার করেছে। বাইডেন প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দেয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৪-১ ভোটে গৃহীত একটি প্রস্তাবও ছিল।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ও একই ধারা অব্যাহত থাকে। ২০২৫ সালের জুনে অবিলম্বে, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে আনা একটি প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র আবারও একমাত্র দেশ হিসেবে ভেটো দেয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আরও একটি প্রস্তাবে ১৪-১ ভোটের একই ফল দেখা যায়।

 

বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশের কাছে গাজা একটি পুরোনো ধারণাকেই আরও জোরালো করেছে—তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ রাশিয়া ও ইরানের মতো কৌশলগত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা জড়িত থাকলে সেই নিয়ম স্থগিত রাখা হয়। এই দ্বিমুখী নীতিই হরমুজ সংকটের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পটভূমি তৈরি করেছে।

 

হরমুজ সিনড্রোম

 

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হলে শক্তির ভারসাম্য ওয়াশিংটনের পক্ষেই ব্যাপকভাবে ঝুঁকে ছিল বলে মনে হচ্ছিল। এর আগের কয়েক মাসে ইরান বেশ কিছু বড় ধাক্কা খেয়েছিল।

 

হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ও অস্ত্রভাণ্ডার ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের ফলে হিজবুল্লাহর কাছে তেহরানের প্রধান স্থলপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সময়ে ইসরাইলি গোয়েন্দারা ইরানের ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হওয়ার প্রমাণও দিয়েছিল। প্রতিরোধ অক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ায় ওয়াশিংটন ও ইসরাইল বিপুল প্রচলিত সামরিক শক্তির অধিকারী ছিল।

 

তবে কৌশলগত পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও তা কৌশলগত সাফল্যে রূপ নেয়নি। যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

 

সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে শুধু উন্নত অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর কিনতেই ব্যয় হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে, যুদ্ধে অন্তত ১৮ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৮৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট, থাড ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে বলেও সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।

 

ইরান হয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করতে পারেনি, কিন্তু তাদের তা করারও প্রয়োজন নেই। তেহরানকে জাহাজে জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে না, কিংবা আকাশ থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবিমান সরিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

 

ভৌগোলিক অবস্থান তেহরানকে বিপুল কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। এর মাধ্যমে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবহন করা হতো। একই সঙ্গে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই জলপথ দিয়ে চলাচল করত।

 

২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর প্রথম ৩৯ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান অভিযান চালায়। শুধু মার্কিন সামরিক বাহিনীই ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। আলাদাভাবে ইসরাইল জানিয়েছিল, তারা প্রায় ৪ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে ১৮ হাজার গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে।

 

কিন্তু এরপরও ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। বরং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। পরে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে স্বীকার করা মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

 

এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের অর্থনীতি চাপে ফেলতে এবং তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ওয়াশিংটন নৌ অবরোধ আরোপ করে। কিন্তু এতেও ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। নিজেদের মূল দাবিতে অনড় থাকে তেহরান। শেষ পর্যন্ত জুনে দুই পক্ষ একটি অস্থায়ী সমঝোতা স্মারকে পৌঁছায়, যা ১৭ জুন স্বাক্ষরিত হয়। এতে ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত মেনে নেয়।

 

তবে তিন সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ের শুরুতে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়। ১৪ জুলাই ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় নৌ অবরোধ চালু করে। কিন্তু আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে এই দ্বিতীয় দফার চাপও কার্যত থমকে যায়।

 

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব কোনো ধরনের চাপই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারেনি। যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পর যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সামুদ্রিক সংকটের মুখে পড়ে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিলই না। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ১২৫টি বড় জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও তা কমে এখন মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজে দাঁড়িয়েছে।

 

এটাই ‘হরমুজ সিনড্রোম’—যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে, কিন্তু তারপরও প্রতিপক্ষকে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হতে পারে।

 

ইয়েমেন এর আরেকটি উদাহরণ। ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক আঞ্চলিক মিলিশিয়া হিসেবে বিবেচিত হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূল এবং ইয়েমেনের পার্বত্য অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করেছে। তাদের হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

 

৫ কোটি ডলারের একটি হামলাকারী ড্রোনকে ১০ কোটি ডলারের একটি স্টেলথ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করতেই হবে—এমন নয়। যদি সেটি প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে ২০ লাখ ডলারের একটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে বাধ্য করে, বাণিজ্যিক বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় কিংবা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বিমার খরচ বাড়িয়ে দেয়, তাহলেই তা অসম মাত্রার ব্যয় চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

 

বিলিয়ন ডলারের একটি বিমানবাহী রণতরী বহর তার আশপাশের জলসীমায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। কিন্তু বিতর্কিত একটি জলপথে ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ চালানোর জন্য বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানি বা বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করতে পারে না।

 

বদলে যাওয়া বিশ্ব

 

উপসাগরীয় দেশগুলো এরইমধ্যেই তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার তাদের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। ইরান তাদের প্রতিবেশী এবং চীন তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে এসব দেশ এখন আঞ্চলিক বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। এর একটি উদাহরণ হলো ‘মক্কা চুক্তি’। গত ৭ আগস্ট তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। ওয়াশিংটনের ওপর কম নির্ভরশীল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলাই এই চুক্তির লক্ষ্য। ভবিষ্যতে মিশর ও ইরানের মতো আরও বড় শক্তিকেও এতে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

কী পরিবর্তন হয়েছে তা বোঝার জন্য কোনো পক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। ইরান ব্যাপক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। সামরিক শক্তির ভারসাম্য বদলায়নি। তবে যে বিষয়টি বদলেছে, তা হলো সেই সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে এখন স্পষ্ট প্রশ্ন উঠেছে।

 

আটটি দেশের সর্বোচ্চ ২০টি মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রম ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এখনো অনেক বেশি। তবে ইরান প্রমাণ করেছে যে, ওয়াশিংটনের পছন্দের আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে গেলে এমন মূল্য দিতে হবে, যা বহন করার মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

 

ইসরাইলও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি। দেশটি শক্তিশালী গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ইরানের ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও করেছে। কিন্তু এসব সাফল্য একাই ইসরাইলের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেনি। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ ইসরাইলের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং নৌবাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

 

২৮ ফেব্রুয়ারির আগে ইসরাইল আশা করেছিল, নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় তারা সামরিকভাবে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু হরমুজ সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতাই স্পষ্ট করে দিয়েছে। আর ঠিক এখানেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। ওই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করেনি। তবে বিশ্ববাসীর সামনে মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

 

১৯৯১ সালের বিজয়কে সম্ভব করে তুলেছিল যেসব ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, আজ তার কোনোটিই আর নেই। চীনও আর পাশ থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়।

 

রাশিয়া সক্রিয়ভাবে পশ্চিমা নিরাপত্তাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে। তুরস্ক, ভারত ও ব্রাজিলের মতো মধ্যম শক্তিগুলোও এখন দুই পক্ষের যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

 

বিশ্বের বাণিজ্য আরও খণ্ডিত হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে কয়েক দশকের যুদ্ধ এবং গাজায় গণহত্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কারণে দেশটির নৈতিক কর্তৃত্বও ক্ষয় হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হতে পারে। তবে এমন এক বিশ্বে তারা আর কাজ করছে না, যেখানে এককভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শর্ত নির্ধারণ করতে পারে।

 

১৯৯১ সালের পর ওয়াশিংটন বিশ্বাস করেছিল, তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে আমেরিকার অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সাজানো সম্ভব। হরমুজ এখন সেই বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতাই দেখিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক শক্তি কোনো প্রতিপক্ষকে ভয়াবহভাবে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের নাও থাকতে পারে।

 

অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে ভিয়েতনামিরা এই পার্থক্যটি বুঝেছিল। আর সাইগন থেকে শেষ মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো উড়ে যাওয়ার পরই ওয়াশিংটন তা উপলব্ধি করেছিল। উপসাগরীয় যুদ্ধ আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সেই শিক্ষা ভুলে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। হরমুজ আবারও ওয়াশিংটনকে সেই শিক্ষা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

 

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল। কয়েক দশক ধরে মার্কিন শক্তির প্রভাব এই প্রণালিকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত বলে মনে করিয়েছে। এখন আর তা মনে হচ্ছে না।

 

(মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত)

 

লেখক: সামি আল-আরিয়ান ইস্তাম্বুল জায়েম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (সিআইজিএ) পরিচালক। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই শিক্ষাবিদ ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার দশক যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। সেখানে তিনি শিক্ষক, বিশিষ্ট বক্তা ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে তিনি তুরস্কে চলে যান।

ভিয়েতনামের শিক্ষা ভুলে হরমুজে একই বাস্তবতার মুখে যুক্তরাষ্ট্র | সময় নিউজ