মায়মুনা হায়দার চৌধুরী
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪
পনিতে ডুবে যাওয়ার প্রতীকী ছবি
গ্রীষ্মের খরতাপ কিংবা বর্ষার স্নিগ্ধ বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা একা সাঁতরে বেড়ানো, কখনও জলকেলি আবার কখনও নানা প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠা; এটাই আবহমান বাংলার চিরাচরিত সৌন্দর্য। শৈশবের এই দুরন্তপনার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সেই স্মৃতি।
কিন্তু এই দুরন্তপনাই কখনও কখনও হয়ে ওঠে বিষাদের কারণ। যে জল শৈশবকে সাজায় উচ্ছ্বলতায়, সেই জলই এক মুহূর্তে কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য শিশুর প্রাণ। এক অভিভাবক বলেন, ‘সাঁতার ছাড়া থাকলে রিস্কের ব্যাপার। খেয়াল রাখা লাগে যে আমার সন্তানরা কোন জায়গায় যাচ্ছে।’
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ জন শিশু জলাশয়ে ডুবে মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডুবে মারা যাওয়ার ৮০ শতাংশেরও বেশি ঘটনা ঘটে বসতবাড়ির মাত্র ২০ থেকে ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা অরক্ষিত জলাশয়ে।
পানিতে ডুবে শিশুর অকালমৃত্যু ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মূলত চারটি বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকের সচেতনতা, জলাশয়ে সুরক্ষাবেষ্টনী নিশ্চিত করা, সঠিক বয়সে শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
উন্নয়নকর্মী সাদিয়া জাফরিন বলেন, ‘এটা মূলত বাবা-মায়ের দায়িত্ব। অনেক সময় দেখা যায়, বড় বোন বা ভাই খেলছে, আর ছোট বাচ্চাটিকে তাদের কাছে রেখে মা নিজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাবা-মায়ের এই অবহেলা কমাতে হবে। কারণ, এই অসতর্কতার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘শিশুরা পুকুর বা বিলগুলোতে যখন যাচ্ছে, তখন অভিভাবকদের এটা তত্ত্বাবধান করতে হবে। এটার মাধ্যমেই এটা কমানো যেতে পারে। সচেতনতাই এখানকার মূল বিষয়।’
একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং জনপদভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে সিপিআর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা দরকার বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উন্নয়নকর্মী সাদিয়া জাফরিন বলেন, ‘বিপদে পড়লে কী করতে পারো, কিংবা তোমার বন্ধুকে কীভাবে সাহায্য করতে পারো; শিশুদের এ ধরনের সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা শেখানো জরুরি। এসব ছোট ছোট বিষয় শিক্ষকরা চাইলেই শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন।’
লে. কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কোনো শিশু পানিতে ডুবে যাওয়ার পর তাকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী পৌঁছাতে যে সময় লাগে, তা অনেক সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। যে ব্যক্তি প্রথমে শিশুটিকে দেখতে পান বা উদ্ধার করেন, তিনিই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাই সবারই সিপিআর সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’
শুধু গ্রামেই নয়, শহরেও বাবা-মাকে বাথটাব কিংবা বালতির পানির বিষয়ে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের উপ-পরিচালক ডা. মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘শিশু হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে বালতি ধরে ওপরে উঠে যেতে পারে। এরপর পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, আর এদিকে মা হয়তো রান্নার কাজে ব্যস্ত। তাই আগে থেকেই সচেতন হতে হবে। বাসায় বালতি রাখলে তাতে পানি না রাখাই ভালো।’
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে পানিতে ডুবে। অথচ অভিভাবকের সচেতনতা, জলাশয় সুরক্ষিত করা এবং সঠিক বয়সে সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে এই শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।

