মহিব আল হাসান
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৫৪

কপিরাইট রেজিস্ট্রার এস, এম, আরশাদ ইমাম ‘ফ্যাসিস্ট আমলের লোকদের’ কপিরাইট অফিসে এনে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রযোজকদের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের গড়িমসি ও হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, কপিরাইট বিধিমালার খসড়া পর্যালোচনা সভায় অংশীজন নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজকদের খসড়া বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান নির্মাতা গাজী মাহবুব। কপিরাইট অফিসের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন জানান, ‘কপিরাইট অফিসের কার্যালয়ে যেতে গেলে নিচে থেকে ৪তলায় উঠতে কয়েকটা ধাপ পার হতে হয়। ভেতরে প্রবেশমুখে দরজা লক করা। ঢুকতে গেলেও দরজার সামনে আরও আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। বাংলাদেশের কোনো সরকারি অফিসে এমন নিয়ম আছে কি না জানা নেই। শুধু তাই নয়, সরকারি সময় অনুযায়ী বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস টাইম থাকলেও তিনি অফিস করেন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। কপিরাইট রেজিস্ট্রার এস, এম, আরশাদ ইমামের একক সিদ্ধান্তেই চলছে কপিরাইট অফিস! তাকে সঙ্গ দেন সহকারী প্রোগ্রামর গাফফার ও শাহজাহান। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এ দুইজনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন করিম আজাদ নামে সাংবাদিক। বর্তমানে অভিযোগের বিষয়টি তদান্তধীন।
কপিরাইট অফিসের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। কপিরাইট সহকারী রেজিস্ট্রার মোস্তাক আহমেদের দাবি, অফিসের দুটি সরকারি গাড়ির দুটিই রেজিস্ট্রার ব্যবহার করেন। এর মধ্যে একটি তিনি নিজে এবং অন্যটি তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। মোস্তাক আহমেদ সময় সংবাদকে বলেন, ‘সরকারিভাবে আমরা গাড়ি পাওয়ার কথা। কিন্তু দুটি গাড়িই রেজিস্ট্রার ব্যবহার করছেন। আমাদের গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়।’ তার অভিযোগ, সরকারি গাড়ির ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এদিকে, সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ২৯ সেপ্টেম্বর কপিরাইট অফিসের একটি গাড়ি নিয়ে রেজিস্ট্রারের পরিবারের সদস্যরা বাইরে যাওয়ার পর গাড়িটি বিকল হয়ে পড়ে। বর্তমানে গাড়িটি ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে।
কপিরাইট অফিসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সহকারী প্রোগ্রামার গাফফার ও শাহজাহান নিয়মিতভাবে কাজ করেন। তাদের বিরুদ্ধে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগটি বর্তমানে তদন্তাধীন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, কপিরাইট বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন ও পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন প্রযোজকদের এই প্রক্রিয়ায় যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন যে আইন সৃষ্টিশীল মানুষের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য, সেই আইনের বিধিমালা তৈরির সময় সৃষ্টিশীল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদেরই যদি পর্যাপ্তভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে সেই বিধিমালার বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা কতটা নিশ্চিত হবে? ৩০ সেপ্টেম্বর কপিরাইট অফিসে অনুষ্ঠিত খসড়া বিধিমালা পর্যালোচনা সভায় সীমিতসংখ্যক অংশীজনকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধিমালার খসড়া নিয়ে আরও বিস্তৃত অংশীজনের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সভা আয়োজন করা হয়েছে।
নির্মাতা গাজী মাহবুব অভিযোগ করে বলেন, কপিরাইট রেজিস্ট্রারের দপ্তরে প্রযোজকদের সেবা পেতে নানা ধরনের গড়িমসি ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। কপিরাইট আইন মূলত সৃষ্টিশীল মানুষদের অধিকার রক্ষার জন্য তৈরি হলেও অতীতেও প্রযোজকদের সঙ্গে নানা ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ করা হয়।
গাজী মাহবুবের অভিযোগ, ‘বিগত সরকারের আমলে প্রযোজকদের নানারকম হয়রানি করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি তাদের আলাদা টান ছিল। বর্তমান সময়েও একই কপিরাইট রেজিস্ট্রার একই ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কপিরাইট বিধিমালার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিগত কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে প্রযোজকদের মতামত কেন যথাযথভাবে নেওয়া হচ্ছে না। তার অভিযোগ অনুযায়ী, সীমিতসংখ্যক অংশীজনকে নিয়ে বিধিমালার খসড়া পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে বাস্তবে চলচ্চিত্র ও সৃষ্টিশীল শিল্পের বড় একটি অংশের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে।
এদিকে, সভায় ‘বাংলা প্রাজল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আমন্ত্রণপত্রের ২০ নম্বর ক্রমিকে প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার বিষয় নয়; বরং অংশীজন নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রাসঙ্গিকতা ও প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো শ্রেণির অংশীজনকে বাদ দিয়ে বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে তা নিয়ে আরও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
কপিরাইট আইন অনুযায়ী কপিরাইট অফিস সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং রেজিস্ট্রার কপিরাইট অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে আইন ও বিধির অধীন নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেন। তাই সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, কপিরাইট বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করার আগে প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, লেখক, সংগীতস্রষ্টা, প্রকাশক, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, কপিরাইট মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব শ্রেণির অংশীজনের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বরের সভায় অংশীজন নির্বাচন, আমন্ত্রণের মানদণ্ড এবং সভা আয়োজনের প্রক্রিয়া কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে—তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা জানতে সময় সংবাদ টিম কপিরাইট অফিসে গেলেও তিনি অফিসে ঢুকতে দেননি। এমনকি মোবাইল ফোনে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালে তা সিন করলেও কোনো উত্তর দেননি।

