অর্থ-বাণিজ্য

ফলের বাজারে অস্থিরতা কেন?

বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫০

ফলের বাজারে অস্থিরতা কেন?

ফলের দোকান। ফাইল ছবি

অসুস্থ মানুষের পথ্য হিসেবে পরিচিত মাল্টা, কমলা কিংবা ডাব; এসব ফল কিনতেও এখন বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। বড় আকারের একটি মাল্টার দামই পড়ছে ১০০ টাকার ওপরে। ডাবের দামও আকারভেদে ২২০ টাকা পর্যন্ত। আমদানি করা ফলের পাশাপাশি দেশি অনেক ফলের দামও অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।

 

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, মানভেদে কোথাও কোথাও প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৫২০ টাকায়। কমলাও মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি পর্যন্ত।

 

অন্যান্য আমদানি করা ফলের দামও চড়া। আপেল ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আঙুর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ডালিম ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নাশপাতির দামও অনেক ক্ষেত্রে ৩০০ টাকার ওপরে।


বিক্রেতারা বলছেন, আড়ত পর্যায়ে বেশ কিছু ফলের দাম বেড়েছে। বেশি দামে ফল কিনে আনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ক্রেতা কমেছে, আবার বিক্রি না হওয়ায় দোকানে ফল নষ্টও হচ্ছে।


ভ্যানে ফল বিক্রি করা নাসির বলেন, ‘আড়ত থেকেই এখন বেশি দামে ফল কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে। আবার বেশি দাম রাখলে ক্রেতা কমে যায়। এতে ফল পড়ে থেকে নষ্টও হচ্ছে।’


বিদেশি ফলের তুলনায় দেশি ফলের দাম কিছুটা কম হওয়ায় অনেক ক্রেতা এখন দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সেখানেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। বাজারে পাকা পেঁপে ৬০ থেকে ১২০ টাকা কেজি, দেশি কলা ৬০ থেকে ১৮০ টাকা ডজন, পেয়ারা প্রায় ১০০ টাকা কেজি, আমড়া ৪০ থেকে ৬০ টাকা, দেশি মাল্টা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, ড্রাগন ফল ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং আনারস ৮০ থেকে ১০০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। ডাবের দাম ১৫০ থেকে ২২০ টাকা পিস।


এর মধ্যে ডাবের দাম নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বেশি। পেঁপে, পেয়ারা, আমড়া, জাম্বুরা, ড্রাগন ফল ও আনারস তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া গেলেও এসব ফলের দামও অনেক পরিবারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় বেশি।


ক্রেতা সুভাষ বলেন, ‘ডেঙ্গু হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ফল ও তরল খাবার দিতে হয়। কিন্তু বাজারে এসে দেখি সবকিছুর দাম অনেক বেশি। সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য পরিস্থিতি খুবই কঠিন। আগে অসুস্থ মানুষের জন্য মাল্টা, কমলা বা ডাব কিনতে খুব বেশি ভাবতে হতো না। এখন এক কেজি মাল্টার দামই ৫০০ টাকা।’


ফল আমদানিকারক ও বিক্রেতারা বলছেন, মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীন থেকে বেশি কমলা ও মাল্টা আসে। এসব দেশে সিজন শেষ হয়ে আসা এবং এক মাস আগে এ দুই ধরনের ফলে ব্যাপক লোকসান হওয়ায় আমদানি কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।


ফল ব্যবসায়ী শাহিন বলেন, ‘কমলা ও মাল্টার আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব পড়েছে। বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের বাজারেও দাম বাড়ে।’


পাইকারি ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফলের উচ্চমূল্যের দীর্ঘমেয়াদি কারণ হিসেবে শুল্ক-কর ও ডলারের বিনিময় হারকে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার পর কেজিপ্রতি ফল পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ছে।


তবে ফলের বাজারে অস্থিরতার পেছনে আমদানিকারকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ফলের বাজারে অস্থিরতার জন্য, বিশেষ করে আমদানি করা ফলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে মূলত আমদানিকারকরাই দায়ী। দেশের কয়েকজন আমদানিকারক বিভিন্ন গ্রেডের ফল আমদানি করে বেশি দামে বিক্রি করেন। যেহেতু ফলের গ্রেডের ভিত্তিতে আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়, তাই প্রায়ই দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে পণ্য আনার সময় এক ধরনের ফল বা গ্রেড ঘোষণা করেন, কিন্তু বাস্তবে অন্য ধরনের বা ভিন্ন গ্রেডের ফল আমদানি করেন।’


এ ধরনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একদিকে তারা সরকারের কর ফাঁকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে এলসি প্রাইস দেখিয়েও মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। এলসিতে যে গ্রেডের ফল আমদানির কথা উল্লেখ থাকে, অনেক সময় সেই গ্রেডের ফল না এনে অন্য গ্রেডের ফল আনা হয়। কিন্তু কাগজপত্রে দেখানো হয় উচ্চ গ্রেডের ফল। ফলে কাস্টমস ও আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের তথ্য দেয়া হচ্ছে, আর সাধারণ ক্রেতাদের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে অন্য তথ্য। এভাবে নানা কৌশলে আমদানি শুল্ক ফাঁকি দেয়া হচ্ছে এবং পণ্যের দাম নিয়েও ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমদানিকারকদের দাবি ছিল, আমদানি শুল্ক বেশি হওয়ায় ফলের দাম বাড়ছে। তাদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আমদানি শুল্কও কমিয়েছে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। আগে যে দাম ছিল, এখনো প্রায় সেই দামই রয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদের পথ্য হিসেবে কিছু ফলের নাম আসায় এবং চিকিৎসকেরা সেগুলো খাওয়ার পরামর্শ দেয়ায় নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে মালটার দাম বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় ডাবের দামও দ্বিগুণ করে দেয়া হয়েছে।’


বাজারে সামান্য চাহিদা বাড়লেই ফলের দাম বেড়ে যায় অভিযোগ করে নাজের হোসাইন বলেন, ‘চাহিদা কিছুটা বাড়লেই দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়, কিন্তু চাহিদা কমলে দাম কমানোর কোনো আলোচনা থাকে না। আমদানিকারক কত দামে এলসি করেছেন, কী দামে পণ্য আমদানি করেছেন, প্রকৃতপক্ষে কোন পণ্য ও কোন গ্রেডের ফল এনেছেন এবং সবকিছু মিলিয়ে তাদের প্রকৃত খরচ কত; এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা দরকার। এসব তথ্য উন্মুক্তও থাকা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও কাস্টমসের কাছ থেকে এসব তথ্য পরিষ্কারভাবে পাওয়া গেলে গণমাধ্যমও প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে পারবে।’


ফলের বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে একদিকে ক্রেতাদের বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাওয়ায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও পড়ছেন লোকসানে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে দামে। আর ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয় ও দামের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং কার্যকর তদারকি না হলে ফলের বাজারে অস্থিরতা কমানো কঠিন।

ফলের বাজারে অস্থিরতা কেন? | সময় নিউজ